Monday , February 20 2017
Home / জাতীয় / রায়পুরায় ‘টেঁটাযুদ্ধ’ চারজন নিহত।

রায়পুরায় ‘টেঁটাযুদ্ধ’ চারজন নিহত।

আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার চরাঞ্চল নিলক্ষায় দুই পক্ষের সংঘর্ষ তৃতীয় দিনে গড়িয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুরে পুলিশ ও দুই পক্ষের ত্রিমুখী সংঘর্ষে চারজন নিহত হয়েছেন। তাঁরা পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন বলে পরিবার দাবি করেছে।

গুলি ও প্রতিপক্ষের টেঁটার আঘাতে আহত হয়েছে ছয় পুলিশসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি। আহত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রায়পুরা থানার ওসি আজহারুল ইসলাম সরকারকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অন্য পুলিশ সদস্যদের ভর্তি করা হয়েছে নরসিংদী জেলা হাসপাতালে। বাকিরা গ্রেপ্তার এড়াতে নরসিংদী ও পাশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে গোপনে চিকিত্সা নিচ্ছে। নিহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নিহত চারজন হলেন নিলক্ষা ইউনিয়নের আমিরাবাদ গ্রামের আলতাফ মিয়ার ছেলে মানিক মিয়া (৪৫), একই গ্রামের ছালামত মিয়ার ছেলে শাহজাহান মিয়া (২৮), সোনাকান্দি গ্রামের অরব আলীর ছেলে খোকন মিয়া (৩২) এবং একই গ্রামের মঙ্গল মিয়ার ছেলে মামুন মিয়া (২২)। তাঁরা সবাই ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হক সরকারের সমর্থক।

নিলক্ষা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হক সরকার ও বর্তমান চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম সমর্থকদের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। দুটি পক্ষের আধিপত্য নিয়ে বিরোধে এর আগেও ওই এলাকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। গত শনিবার থেকে আবার সংঘর্ষ, হামলা পাল্টাহামলা চলছে। গত তিন দিনে কয়েকটি গ্রামে উভয় পক্ষের ৩০ থেকে ৩৫টি বাড়িঘরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। তাজুল নিলক্ষা ইউনিয়ন শাখা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। আব্দুল হক দলটির রায়পুরা উপজেলা শাখার সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক।

পুলিশ ও এলাকাবাসী জানায়, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন তাজুল ইসলাম। আনারস প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করেন তৎকালীন চেয়ারম্যান আব্দুল হক সরকার। নির্বাচনের পর থেকেই এলাকার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য নিয়ে বিজয়ী চেয়ারম্যান ও পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষ শুরু হয়। গত সাত মাসে কমপক্ষে ১৫ বার সংঘর্ষে জড়ায় দুজনের সমর্থকরা। এতে কমবেশি তিন শতাধিক লোক হতাহত হয়। ভাঙচুর করা হয় শতাধিক বাড়িঘর। লুট করা হয় গোয়ালের গরু, ধানসহ বিভিন্ন মূল্যবান জিনিসপত্র।

এসব ঘটনায় সাবেক চেয়ারম্যন আব্দুল হক সরকারকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ অভিযান চালিয়ে টেঁটা, বল্লমসহ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রও উদ্ধার করে। পুলিশের এই বিশেষ তত্পরতায় সাময়িকভাবে বন্ধ হয় দুই পক্ষের মধ্যে হানাহানি।

সম্প্রতি সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হক সরকারের সমর্থক শহীদ হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। এর পর থেকে প্রতিপক্ষের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য সংঘবদ্ধ হতে শুরু করে ওই পক্ষ। এ নিয়ে এলাকায় আবার উত্তেজনা দেখা দেয়।

এরই জের ধরে গত শনিবার রাত থেকে এই সংঘর্ষ শুরু হয়। রবিবার সংঘর্ষে কমপক্ষে অর্ধশতাধিক লোক আহত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এরই মধ্যে গতকাল আবার দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, দুপুর ১২টার দিকে নিলক্ষা মাঠে হরিপুর, গোপীনাথপুর, কান্দাপাড় ও বীরগাঁও গ্রামের কয়েক হাজার লোক টেঁটা, বল্লম ও অন্য দেশীয় অস্ত্র, ককটেল নিয়ে সংঘর্ষে জড়ায়। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় আমিরাবাদ ও সোনাকান্দি গ্রামের লোকজন। মাঠের সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে। দুই পক্ষই প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। অন্তত ৩০টি বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ ও এলাকাবাসী জানায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে পুলিশ ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এ সময় পুলিশের ওপর ককটেল ও টেঁটা নিয়ে হামলা চালায় সংঘর্ষকারীরা। এতে করে ত্রিমুখী সংঘর্ষ বেধে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড ও শটগানের গুলি ছোড়ে।

পুলিশ জানায়, সংঘর্ষের সময় ককটেলের স্প্লিন্টারে আহত হন রায়পুরা থানার ওসি আজহারুল ইসলাম সরকার। টেঁটাবিদ্ধ হন উপপরিদর্শক (এসআই) আসাদ। এ ছাড়া গুরুতর আহত হন এসআই জিয়া, তোফাজ্জল ও দুজন কনস্টেবল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে নরসিংদী থেকে অতিরিক্ত পুলিশ পাঠানো হয়।

বিকেলে নিলক্ষা মাঠ থেকে সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হক সরকারের সমর্থক আমিরাবাদ গ্রামের মানিক মিয়া ও শাহজাহান মিয়া, সোনাকান্দি গ্রামের খোকন মিয়া ও মামুন মিয়ার মৃতদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় লোকজন।

নিহতদের পরিবারের দাবি, পুলিশের গুলিতে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে। তবে পুলিশ বলছে, সুরতহাল না করা পর্যন্ত বলা যাবে না তাঁরা কিভাবে মারা গেছেন।

নরসিংদীর পুলিশ সুপার আমেনা বেগম সাংবাদিকদের বলেন, ‘সংঘর্ষে চারজন নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে একজনের মৃতদেহ আমরা পেয়েছি।’ লাশটি ময়নাতদন্তের জন্য নরসিংদী সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।

পুলিশ সুপার কালের কণ্ঠকে বলেন, সংঘর্ষকারীরা দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি, ককটেল ও আগ্নেয়াস্ত্রও ব্যবহার করেছে। পুলিশের হাতে যে ব্যক্তির লাশ আছে তিনি টেঁটাবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। অন্যদের লাশ হাতে পেলে জানা যাবে কিভাবে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে। তিনি জানান, ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাসিবুল আলমকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

সরেজমিনে এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নিলক্ষা ইউনিয়নের হরিপুর এলাকায় বাতাসে ভাসছে পোড়া গন্ধ। বেশ কয়েকটি বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে। ওই সব বাড়ির ঘরগুলোতে পোড়া কাঠ, কয়লা আর ছাই ছাড়া কিছুই নেই। টিন পুড়ে দুমড়েমুচড়ে গেছে। বাড়ির সামনে খড়ের গাদায় আগুন দেওয়া হয়েছে। কোনো বাড়ির লোহার গ্রিল ভেঙে ফেলা হয়েছে। ভেঙে ফেলা হয়েছে ঘরের দেয়াল, তারপর দেওয়া হয়েছে আগুন।

সংঘর্ষের বিষয়ে জানতে নিলক্ষা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁর ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত গোপীনাথপুর গ্রামের আবদুল জব্বারের অভিযোগ, সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হক সরকার, তারু মেম্বার, মোরশেদ মেম্বার, শহি মিয়া—এ চারজনের নেতৃত্বে নিলক্ষাকে শ্মশানে পরিণত করা হয়েছে। তাঁরা পাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে লোকজন ও অস্ত্র ভাড়া করে এনে সংঘর্ষ করছেন। দড়িগাঁও গ্রামের শতাধিক বাড়িঘর, হরিপুরের যুবলীগ নেতা সমেদ আলীর বাড়িসহ অর্ধশতাধিক বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাট চালানো হয়েছে। বাড়িঘর যখন লুটপাট করেছে তখন পুলিশ ফাঁকা গুলি করলে হতাহতের ঘটনা ঘটে বলে দাবি করেন জব্বার।

সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হক সরকারের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

ঘটনাস্থল থেকে সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) বশির উদ্দিন বলেন, প্রায় সাতটি গ্রামের লোকজন সংঘবদ্ধ হয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। পুলিশ কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং জানমাল রক্ষার চেষ্টা চালায়। তিনি আরো বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তিন শতাধিক কাঁদানে গ্যাস শেল, রাবার বুলেট ও শটগানের গুলি ছোড়া হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেডও ব্যবহার করেছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাসিবুল আলম বলেন, সাবেক ও বর্তমান দুই চেয়ারম্যানের সঙ্গে বিরোধ মেটানোর আলোচনা চলছিল। এর মধ্যে তাঁদের সমর্থকরা আবার সংঘর্ষে জড়িয়েছে। পুলিশ বাধা দিলে তারা পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এ ঘটনায় আটক করা হয়েছে ১৩ জনকে। থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।

About Monira Islam

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *